রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির বিরুদ্ধে একাধিক প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। তবে মামলাটিতে সিদ্ধার্থ দাসের পরনে থাকা শার্ট নিয়ে বিতর্ক এখনও থামেনি।
পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী দাবি করেছেন, আসামি সিদ্ধার্থ দাসের শরীরে যে শার্ট দেখা গেছে, সেটি তার নিজের নয়। তার ভাষ্য, তিনি শার্টটি আড়ং থেকে কিনেছেন। একই ডিজাইনের শার্ট অন্য কেউও আড়ং থেকে কিনে থাকতে পারেন।
এ বিষয়ে কালবেলার রংপুর ব্যুরো আড়ংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আড়ংয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে ওই শার্টটি তাদের স্টকে নেই। এটি নিয়মিত পণ্যও নয়; কোনো একটি ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে আনা হয়েছিল। সেটি পূজা বা ঈদ—কোন উপলক্ষ ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি ওই কর্মকর্তা। তিনি জানান, গত দুই-এক মাসেও শার্টটি আড়ংয়ের কোনো আউটলেটে আসেনি এবং বর্তমানে এটি স্টক আউট।
এদিকে এ মামলায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের আত্মীয়স্বজনও জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন।
চারজনের মরদেহ উদ্ধারের সময় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে সিদ্ধার্থকেও দেখা যায়। তখনও তার পরনে টি-শার্ট ছিল। সিদ্ধার্থের কয়েকজন প্রতিবেশী ও বন্ধু জানিয়েছেন, ওই শার্টটি তারা আগে কখনো তাকে পরতে দেখেননি।
পরে পুলিশ তাকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করলে তার পরনে পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীর পরা শার্টের সঙ্গে একই রং ও ডিজাইনের আরেকটি শার্ট দেখা যায়। এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সনাতন চক্রবর্তী বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেন, একই শার্ট আলাদা ব্যক্তি পরতেই পারেন। ভিডিও বার্তাতেও তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
পুলিশের দাবি, দুই সন্দেহভাজনের একজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান টের পেয়ে পালিয়ে পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগানে লুকিয়ে পড়েন। পরে তুতবাগানের পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের সময় রংপুরের বিভিন্ন স্থানীয় ফেসবুক পেজের লাইভ ভিডিওতেও একজনকে একই ধরনের শার্ট পরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখা যায়। তার মুখে মাস্ক ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীই ওই ব্যক্তি ছিলেন বলে জানা গেছে।
রংপুর পুলিশের একটি সূত্র জানায়, দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের শরীরে নখের আঁচড়ের চিহ্ন দেখা যায়। বিশেষ করে ডিবির এক সোর্স সিদ্ধার্থের শরীরে নখের আঁচড় থাকার তথ্য দিয়েছিলেন। এরপর তাকে ডিবি কার্যালয়ে এনে পোশাক খুলে শরীর পরীক্ষা করা হয়।
এর আগে গত শনিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কিনে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের সীমান্ত নামের এক ব্যক্তির বাসায় বসে সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে তারা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে আসেন।
তবে পুলিশের এই বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, ইয়াবা সেবনের জন্য দেবুর নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের ফাঁকা জায়গা ও ছাদ ব্যবহার না করে অভিযুক্তরা কেন গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গেলেন।
জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, অল্প সময়ে মামলার তদন্তে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তাতে তিনি সন্তুষ্ট। পুলিশের ভালো কাজের প্রশংসা এবং নেতিবাচক কাজের সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত তার ওপর আস্থা রাখা যেতে পারে। এরপরই তিনি ব্রিফিং শেষ করেন।
রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রোববার কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
[সূত্র: কালবেলা]
Create a Social Card
Convert this news into a shareable image card instantly.