৫আগস্ট ২০২৪, সকাল ১০টা। অবস্থান করছিলাম শাহবাগ এলাকায়। প্রথমে পিজি হাসপাতালের পেছনের রাস্তা। এরপর সেখান থেকে শাহবাগ মোড়ে। এসেই শুনি শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। মোড়ের আইল্যান্ডে বসে মানুষের উল্লাস দেখছি।
খুব দ্রুতই সেই উল্লাস নানা মাত্রায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। অদূরেই দেখতে পেলাম সেনাবাহিনীর একটা গাড়িকে ঘিরে উৎসাহী জনতা স্লোগান দেওয়া শুরু করেছে— “এই মূহুর্তে দরকার, সেনাবাহিনীর সরকার”। অনেকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছিলেন সেনা সদস্যদের। আর আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পরা শুরু করলেন কয়েকজন; আমার সামনেই।
এরমধ্যেই দেখা গেলো, জুলাই আন্দোলনেরই কয়েকজন বামপন্থী কর্মী, যারা একটু আগেই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, তাদের কাঁধে তুলে নাচতে শুরু করে দিয়েছেন সতীর্থরা। কিন্তু একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছিল ভিন্ন “মুক্তি”র গল্পও। প্রায় কাছাকাছি সময়ে জেল থেকে পালিয়েছিলেন এমন আরও কিছু লোক, যাদের সঙ্গে জিহাদি সন্ত্রাসবাদের সংশ্লিষ্টতা থাকার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে শুরু করেছে, কারা যেন বিভিন্ন কারাগারে হামলা চালিয়েছে। কেউ কেউ রাস্তায় গাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। এমন কি শাহবাগের আশেপাশেও গাড়ি পুড়িয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে কাউকে কাউকে উল্লাস করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে, মানুষ মারছে— এমন খবরও আসতে শুরু করেছে ততক্ষণে। এমন সময়েই মায়ের ফোন। মা থাকেন সুদূর নীলফামারীতে। উদ্বিগ্ন গলায় বললেন— “শেখ হাসিনা তো চলে গেলো, এবার হিন্দুদের অবস্থা কী হবে?”
আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা এভাবেই এই দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আচ্ছন্ন করে রাখতে পেরেছিল। আওয়ামী লীগকে ত্রাতা ভাবতেই সাচ্ছন্দবোধ করেন এই ধর্মাবলম্বীরা। আমার মা-ও তাই ভাবছেন। জুলাইয়ে এমন ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরও স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার প্রতি হিন্দুদের একটা অংশের মোহ এখনো কীভাবে অবশিষ্ট আছে, দেখে বিস্ময় লাগে।
হাসিনার দীর্ঘ শাসনে এই দেশের হিন্দুদের তো কম মূল্য দিতে হয়নি। জুলাইয়েও তো হাসিনার বাহিনীর গুলিতে প্রাণ গেছে রিয়া গোপ, হৃদয় চন্দ্র তরুয়া, সৈকত চন্দ্র দে ও দীপ্তদের মতো হিন্দু সন্তানের। হাজার হাজার হিন্দু ঘরের সন্তান তো জুলাই আন্দোলনেই অংশ নিয়েছে। হাসিনা সরকারের চালানো হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে মিছিলে নেমেছে। জুলাই অভ্যুত্থান তো কোনো সাম্প্রদায়িক অভ্যুত্থান বা ইসলামী অভ্যুত্থানও ছিল না। তারপরও হিন্দুরা এমন ভয় পাচ্ছে কেন?
আমার তখন মিশ্র অনুভূতি। আমি জানি না, আমার কী করা দরকার। আমি জানি না, মাকে আমার কী বলা দরকার। আমি হিন্দু ঘরের মেয়ে। আবার আমি এই আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। মা জানতেন। মা শুধু আমাকে বললেন— “সাবধানে থাকিস”।
আমি শাহবাগের সেই আইল্যান্ডেই বসে ছিলাম। নিরুত্তাপ, ভাবলেশহীন কিছুটা। কারণ, অনেকগুলো প্রশ্ন আমাকে তখন অবিরত ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছিল।
ওরা সেনাশাসন চাইছে কেন? ওরা কি জানে না, এর আগের সেনাশাসন বা সেনাসমর্থিত সরকারগুলো কেমন ছিল? এই যে রাস্তায় নামাজ পড়া শুরু করলো — এর অর্থই বা কী? এই যে মায়ের কণ্ঠে উদ্বেগ, এই উদ্বেগের উৎস কোথায়? এই যে গাড়ি পুড়িয়ে উল্লাস করছে, দোকানপাট-বাড়িঘর পুড়িয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে — আমরা কি চেয়েছিলাম, এমন কিছু ঘটুক? আমরা কি চেয়েছিলাম, এমন বর্বর কায়দায় মানুষ উল্লাস করুক, উৎসব করুক? না, আমরা এমন কিছু চাইনি। আমরা শুধু চেয়েছিলাম একজন অত্যাচারী ও স্বৈরশাসককে সরিয়ে দিতে এবং চেয়েছিলাম একটি বৈষম্যবিহীন দেশ। আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্র।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর থেকে জুলাই আন্দোলনে যে প্রত্যয় নিয়ে অংশ নিয়েছিলাম, গণঅভ্যুত্থানের দিন সকাল থেকে এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আর সারাদেশের খবর শুনতে শুনতে সেই স্বপ্ন যেন ফিকে হতে শুরু করে। মন অস্থির হতে শুরু করে। সময় যত গড়াতে থাকে ততই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার খবর আসতে শুরু করে। ফোনে শুনতে পাওয়া মায়ের উদ্বেগই যেন সত্যি হতে শুরু করে ধীরে ধীরে।
শাহবাগ থেকে কয়েকজন মিলে রমনা কালী মন্দিরের দিকে চলে গেলাম। সেখানে বসলাম কিছুক্ষণ। আমার সাথে যারা ছিল সবাই একসময় একেক দিকে চলে গেল। এক জুনিয়রকে নিয়ে, কিছুটা বিষণ্ন মনেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাসের ওপর গিয়ে বসলাম। ততক্ষণে আরেকবার বাড়ির লোকজনের খবর নিলাম ফোনে। তার বেশ শঙ্কিত। কারণ তারাও ততক্ষণে এমন সব খবর পাওয়া শুরু করেছে যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আগুন দেওয়া হচ্ছে, বাসাবাড়িতে হামলা হচ্ছে। টার্গেট— আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর লোকজন।
ভয় আমারও লাগতে শুরু করেছে। কারণ, আমার স্মৃতিতে তখন ভাসছে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের একটি ঘটনা। তৎকালীন সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূরের গাড়ি বহরে যে হামলা হলো, সেটা ছিল আমার এলাকায়। ঘটনাটা ছিল একান্তই রাজনৈতিক। কিন্তু রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছাড়িয়ে সেই ঘটনা সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি আক্রমণ করা হয়েছিল আমাদের গ্রামের সাধারণ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরেও। রাতের আঁধারে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল হিন্দুদের বসতবাড়ি। সেই ভয়াবহ দিনটার কথা মনে পড়তেই আমি এখনো আঁতকে উঠি।বাংলাদেশে বহু মানুষের ধারণা আওয়ামী লীগ কর্মী ও হিন্দু জনগোষ্ঠী একই মতাদর্শী, একই গোত্রীয় লোক। আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও পরিণতির সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয় এই দেশের হিন্দুদের। ফলে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই দেশের হিন্দুসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বারবার আক্রমণের শিকার হয়। সবচেয়ে বড় মূল্য তাদেরই চুকাতে হয়। কাজেই, আরেকটি পটপরিবর্তনের পর এবং আওয়ামী লীগের এই ভয়ঙ্কর পতনের পর, মায়ের উদ্বেগের সঙ্গে সঙ্গে আমার ভয়ও ঘনীভূত হতে থাকে।
এর মধ্যে ইন্টারনেট চালু করতেই আমার মেসেঞ্জারে আসতে থাকে একটার পর একটা দুঃসংবাদ— “দিদি এখানে ওর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে”, “এখানে মন্দিরে হামলা হয়েছে”, “অমুক পাড়ায় দা-কিরিচ নিয়ে ঢুকছে একদল লোক” — ইত্যাদি।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না। মনে আছে, চুপচাপ কেঁদেছিলাম অনেকক্ষণ। বাইরে আমার সহযোদ্ধারা বিজয়ের আনন্দে মত্ত। আর আমার বুকে তখন আর্তনাদ। উদভ্রান্তের মতো ভাবছি— বিজয় কি বেহাত হয়ে গেলো?
আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে ছিলাম না। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম, অত্যাচারী হাসিনার শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটুক। আমি চেয়েছিলাম, ১৬ বছরের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে, দমবদ্ধ শাসন থেকে এই দেশের মানুষ মুক্তি পাক। আমার তখন যে ফেসবুক আইডি ছিল, সেটাতে আমি নিয়মিত লিখতাম। নিয়মিত জুলাই আন্দোলনের পক্ষে অ্যাক্টিভিটি চালিয়েছি। ১৬ জুলাইয়ের পর থেকে একটা দিনের জন্যও রাস্তা থেকে সরে যাইনি। অনেকের মতো আমিও হাসিনাশাহীর শেষ দেখতে চেয়েছিলাম। যখন রাস্তায় ছিলাম, মিছিলে ছিলাম, সহযোদ্ধাদের সঙ্গে গানে বা স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়েছি, আবু সাঈদ-মুগ্ধদের বুকে গুলি চালানোর দৃশ্য দেখে অঝোরে কেঁদেছি, তখন একবারও আমার মনে হয়নি আমি একজন হিন্দু, আমি একজন নারী।
কিন্তু ৫ আগস্ট, সকাল থেকে রাতের দিকে দিনটা গড়িয়ে যেতে যেতে এই দেশ আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, আমি একজন হিন্দু, আমি একজন সংখ্যালঘু।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়গুলোতেও আমাকে বারবার ওই হিন্দু পরিচয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। কারণ, কেবল হিন্দু হওয়ার কারণেই আক্রান্ত হতে হয়েছে অনেক মানুষকে। সেসব ঘটনার বিচার দূরে থাক, উপরন্তু অনেক ঘটনাকে লুকানোও হয়েছে। এমন কি আমি নিজেও অনেক ঘটনা লুকিয়েছি আমার পরিবারের কাছ থেকে। তাদের এই বলে প্রবোধ দিয়েছি যে, “ওসব আক্রমণ হিন্দু হওয়ার কারণে নয়।”
জুলাই আন্দোলনে আমার অংশ নেওয়া নিয়ে আমার পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশির কোনো প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু হাসিনার পতনের পর থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হওয়া নিগ্রহ-নিপীড়ন আমার মধ্যে এই প্রশ্নের উদ্রেক ঘটিয়েছে যে, তাহলে আওয়ামী লীগ ছাড়া এই দেশে সংখ্যালঘুদের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারলো না কেউ?
আওয়ামী লীগ আমলেও ব্যাপক সংখ্যালঘু নিপীড়ন ঘটেছে। খোদ আওয়ামী লীগের লোকদের দ্বারাও অনেক সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। এরপরও আওয়ামী লীগ এমন ন্যারেটিভ সৃষ্টি করতে পেরেছিল যে, আওয়ামী লীগ ছাড়া এই দেশে হিন্দুরা নিরাপদ নয়। আমার পরিবার, আমার পাড়া-প্রতিবেশিরা এই ভেবে স্বস্তি পেতো যে, একমাত্র আওয়ামী লীগই এই দেশে হিন্দুদের রক্ষাকর্তা। ছোটবেলা থেকে এই ন্যারেটিভ শুনে শুনেই বড় হয়েছি। ফলে মনে একটা ক্ষোভ ছিল— কীভাবে আওয়ামী লীগের মতো একটা দল নিরাপত্তার মূলা ঝুলিয়ে সংখ্যালঘুদের মগজ করায়ত্ত করে রেখেছে।
তো, সেদিন আমি যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দুদের ওপর হামলা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মন্দির ভাঙচুর এবং জমি দখলের খবর পাচ্ছিলাম, সেই মুহূর্তে আমার আওয়ামী-বিরোধী অটুট কনভিকশনে চিড় পড়লো। বুঝলাম যে, এই দেশে ততদিনে আমার দুটি ভিন্ন, পরস্পরবিরোধী পরিচয় সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আমি এই এই অভ্যুত্থানের একজন কর্মী, অন্যদিকে আমি একজন হিন্দু।
অভ্যুত্থানে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়ে পড়েছিল বিপর্যস্ত। সর্বত্র যখন এসব নিপীড়ন চলছিল, তখন প্রশাসনও ছিল একেবারে নিষ্ক্রিয়। ফলে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক ভর করেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় এত এত খবর ও গুজব একসঙ্গে প্রচারিত হচ্ছিল যে, আতঙ্কের মাত্রা পৌঁছেছিল চূড়ান্ত স্তরে।
আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবের অনেকে খোঁচা দিয়ে মেসেজ পাঠাচ্ছিল– “কী, কেমন ফিল করছিস? বেশ বিজয়ের আনন্দে মেতে আছিস, না?”
আমি হিন্দু হয়েও এই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম, এখন তো হিন্দুদের ওপরেই আক্রমণ চলছে, আমার কেমন লাগছে— এই ছিল তাদের প্রশ্ন, এই ছিল তাদের উপহাস। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই ঘাসের ওপর বসে কান্না চাপতে চাপতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, হতাশ হয়ে বসে থাকলে চলবে না।
আমি আমার জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচিতদের নিয়ে একটি নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরি করলাম। আমার লক্ষ্য ছিল দুটি। প্রথমত, কোথাও কোনো হামলার খবর শুনলেই সাথে সাথে সেই নির্দিষ্ট এলাকার লোকজনের সাথে যোগাযোগ করে ফ্যাক্ট-চেক করা, ঘটনাটা আদৌ কতটা সত্য সেটা জানা। দ্বিতীয়ত, সত্যতা পেলে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট সিস্টেমের সাথে সংযোগ করিয়ে দেওয়া। যেখানে যেখানে আমার পরিচিত মানুষজন আছে সবার সাথে কথা বলা শুরু করলাম।
আমি আবারও আমার অস্তিত্ব ও বিশ্বাস ফিরে পেলাম। একটা সীমিত সময়ের জন্য যে কানেক্টিভিটি তৈরি করেছিলাম, সেখানে আমাকে হিন্দু-মুসলিম সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কেউ মন্দির পাহারা দিয়ে পাশে থেকেছে, কেউ সাহস দিয়ে পাশে থেকেছে, আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থেকে ঠেকিয়ে দিয়েছে সম্ভাব্য অনেক হামলা।
অনেক জায়গায় দেখেছি রাজনৈতিক ক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আবার অনেক জায়গায় রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে নিতান্তই জমি দখল বা লুটপাটের উদ্দেশ্যে হিন্দুদের টার্গেট করা হয়েছে।
এই কাজটা করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি যে, অনেকে স্রেফ গুজবকে সত্য ঘটনা বলে চালিয়ে দিয়েছেন, আবার অনেক গুজবের মধ্যে চাপা পড়ে গেছে সত্য ঘটনাও। শুধু গুজবের প্রাবল্যের কারণে নিরেট সহিংসতার ঘটনাকে সত্য বলে মেনে নেননি অনেকে। হিন্দুদের ওপর আক্রমণ যদি জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হয়, তখন অনেক সাংবাদিক শুধু জমির বিরোধকে বড় করে দেখেছে। কিন্তু ভুক্তভোগী হিন্দু বলেই তাকে দুর্বল লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নটি কে করবে?
গণ-অভ্যুত্থানের পর শপথ গ্রহণের দিন আমার ফেসবুকে একটা পোস্ট করেছিলাম। লিখেছিলাম— “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী সরকার কেন শুধু কোরআন পাঠ করে শপথ গ্রহণ করলো, কেন গীতা পাঠ হলো না, বাইবেল পাঠ হলো না।”
পোস্ট দেওয়ার সাথে সাথে হাজার হাজার মানুষের শেয়ার, কমেন্ট। সেদিনই আমি সবথেকে বেশি আক্রমণের শিকার হই। আক্রমণের প্রধান কারণ, আমি হিন্দু হয়ে কেন এই প্রশ্ন তুলেছি। অকথ্য গালি দেওয়া হয়েছে শুধু হিন্দু হওয়ার কারণে। মেসেঞ্জারে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে অনেকে। আওয়ামী লীগের দালাল, ইন্ডিয়ার দালাল বলে ট্যাগ দিয়েছে। অনেকে ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে। রিপোর্ট করে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আমার সেই ফেসবুক আইডি। অথচ আমি জুলাইয়ের রাজপথেরই একজন কর্মী। শুধু একটা প্রশ্ন তোলার কারণে আমি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম।
এরপর বেশ কয়েকদিন আমাকে মাস্ক পরে বাইরে বের হতে হয়েছিল। আমার পরিবার থেকে আমাকে সাবধান করা হয়েছিল, যেন আমি আর কখনো এসবে না জড়াই। আমার জন্য আমার পরিবারের ওপর যে কোনো সময় আক্রমণ নেমে আসতে পারে— এমন উদ্বেগ নিয়ে আমাকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে। অথচ, জুলাই আন্দোলনে নামতে আমার পরিবার বাধা দেয়নি। বরং, আন্দোলন “সফল” হওয়ার পরই উল্টো আমার পরিবারকে খোদ আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়েছে। এটাই সম্ভবত এই সাফল্যের সবচেয়ে নির্মম পরিহাস।
Create a Social Card
Convert this news into a shareable image card instantly.