নিজস্ব প্রতিবেদক

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ও ২০২৬ সালের জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পালকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ট্রল ও সমালোচনার বিপরীতে এবার দেশজুড়ে শুরু হয়েছে সংহতির ঢেউ।

সম্প্রতি বৃষ্টির আবহে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের সঙ্গে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটাহাঁটির একটি ভিডিও নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করেন বিউটি পাল। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর একটি গোষ্ঠী তাকে নিয়ে কটাক্ষ, ট্রল এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি তোলে।

তবে এই ঘটনার পর উল্টো তার পাশে দাঁড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক ও নানা পেশার মানুষ। একই গানের সঙ্গে নিজেরাও ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে প্রকাশ করছেন তারা। এভাবেই বিউটি পালের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রতিবাদের নতুন ধারা তৈরি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

সাংবাদিক রিমু সিদ্দিক নিজের ভিডিও প্রকাশ করে লেখেন, বৃষ্টি কখনো আনন্দ, কখনো অনুভূতি, কখনো স্মৃতির প্রতীক। একজন শিক্ষকের প্রকৃতিকে উপভোগ করাকে অশালীনতা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, শিক্ষকও একজন মানুষ—তিনিও হাসবেন, কাঁদবেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন এবং জীবনকে উপভোগ করবেন। সমালোচনা হওয়া উচিত দায়িত্বহীনতা বা অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে, নির্মল আনন্দের বিরুদ্ধে নয়।

শিক্ষিকা দীপা মণ্ডল লিখেছেন, শিক্ষকদের সবসময় সৃজনশীল হতে বলা হয়, কিন্তু নিজের আনন্দ প্রকাশ করলেই প্রশ্ন তোলা হয়। তার ভাষায়, শাড়ি পরিহিত একজন সম্মানিত শিক্ষকের এমন একটি ভিডিওকে অশ্লীলতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা অযৌক্তিক।

শিক্ষক শায়ফুল ইসলাম লিকু বলেন, শিক্ষকরা মানুষ নন—এমন ধারণা থেকেই এ ধরনের সমালোচনা আসে। তিনি মনে করেন, ভিউয়ের আশায় শিক্ষকদের নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে সবাইকে একসঙ্গে প্রতিবাদ করতে হবে।

শিশুসাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালী লিখেছেন, শিক্ষকও রক্ত-মাংসের মানুষ। তারও আনন্দ, অনুভূতি ও ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে। কোনো আচরণ যদি শ্লীল ও মার্জিত হয়, তবে তা পেশাভেদে ভিন্নভাবে বিচার করার সুযোগ নেই।

সাংবাদিক ঝর্না মনি স্মৃতিচারণ করে জানান, ছোটবেলা থেকেই বিউটি পাল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। স্কুলজীবনে নাচ, গান, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন। তাই তার এই স্বাভাবিক আনন্দঘন মুহূর্তকে বিতর্কিত করে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

এ বিষয়ে বিউটি রানী পাল বলেন, “এটি আমার ব্যক্তিগত বিষয়। একজন শিক্ষক হওয়ার আগে আমি একজন মানুষ, একজন নারী। আমারও অনুভূতি আছে, আনন্দ আছে, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে। একজন শিক্ষক যদি কর্মদক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হতে পারেন, তবে তার ব্যক্তিগত জীবনের স্বাভাবিক মুহূর্তগুলোকে বিতর্কিত করা উচিত নয়।”

বিউটি পালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন দুটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও, তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভিডিও প্রকাশের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অনেকের মতে, এটি শুধু একজন শিক্ষকের প্রতি সংহতি নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষারও একটি প্রতীকী প্রতিবাদ।