চ্যানেল ওম নিউজ ডেস্ক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি হাড়াতলী এলাকায় নিহত কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৪)-এর মৃত্যু ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। ঘটনার তদন্তে র্যাব তিনজন সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বুলেট বৈরাগীর মাথার পেছনে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের উপস্থিতি সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি হত্যার আশঙ্কাকেও জোরালো করেছে।
র্যাব-১১ সিপিসির অধিনায়ক মেজর সাদমান ইবনে আলম বলেন, “এটি একটি ক্লুলেস মার্ডার। হত্যা না হলে মাথার পেছনসহ শরীরে এ ধরনের জখম থাকার কথা নয়। মহাসড়কের পাশে এভাবে মরদেহ পড়ে থাকাও স্বাভাবিক নয়।” তিনি আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে এবং দ্রুতই জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।
র্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন শনিবার ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সচল ছিল। রাত আড়াইটার আগ পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে তার কথা হয়, এরপর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বর্তমানে মোবাইল ফোনের ট্র্যাকিং ডেটা ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তকারীদের অন্যতম বড় প্রশ্ন—বুলেট বৈরাগী কেন কুমিল্লা শহরে নামার নির্ধারিত স্থান পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে না নেমে আরও প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে কোটবাড়ি হাড়াতলী এলাকায় গেলেন? কারা তাকে সেখানে নিয়ে যায় এবং কেন—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
র্যাব এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি তিনি চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে কোন বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে গোল্ডেন পরিবহন ও সেন্টমার্টিন পরিবহনের নাম এলেও তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
রোববার সকালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মাথা, শরীরের পেছনের অংশ এবং বাম হাতে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে এটি দুর্ঘটনা নাকি হত্যা—তা নিশ্চিত হতে ভিসেরা ও অন্যান্য নমুনা পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।
সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, “সড়ক দুর্ঘটনা, ছিনতাই—সব দিক বিবেচনায় নিয়েই তদন্ত চলছে। দ্রুতই প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।”
নিহতের বাবা সুশীল বৈরাগী ও মা নীলিমা বৈরাগী দাবি করেছেন, দুষ্কৃতকারীরা তার সঙ্গে থাকা দামি ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ও টাকার জন্য তাকে হত্যা করেছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। এ ঘটনায় সদর দক্ষিণ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, যদিও এখনো কাউকে আসামি করা হয়নি।
মর্মস্পর্শী বিষয় হলো, আগামী সোমবার (২৭ এপ্রিল) নিহত বুলেট বৈরাগীর একমাত্র ছেলে সন্তানের বয়স এক বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। মাত্র চার দিন আগেই ছিল তার বিবাহবার্ষিকী।
পুলিশ জানায়, শনিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা ব্যর্থ হলে মরদেহের ছবি বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। প্রায় ৫ ঘণ্টা পর পরিবারের সদস্যরা এসে মরদেহ শনাক্ত করেন।
ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একটি ফুটেজে গভীর রাতে একজন ব্যক্তিকে ওই এলাকা দিয়ে চলাফেরা করতে দেখা গেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহত বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ডুমুরিয়া বাবুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কাস্টমস কার্যালয়ে যোগদান করেন এবং সর্বশেষ কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা শহরে পরিবারসহ ভাড়া বাসায় থাকতেন। গত ১১ এপ্রিল প্রশিক্ষণের জন্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন।
রোববার ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে সন্ধ্যায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
Create a Social Card
Convert this news into a shareable image card instantly.