সুজন কুমার রায়, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নে ঐতিহ্যবাহী “বুড়ার পাট” নামটি শুধু একটি স্থানের পরিচয় নয়—এটি বহু প্রজন্মের বিশ্বাস, স্মৃতি এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক গভীর প্রতিচ্ছবি। এই স্থানের মূল আকর্ষণ ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি প্রাচীন শিলা, যাকে স্থানীয় মানুষ ভালোবেসে “রাজা ঘাটিয়াল” বা “বুড়া ঠাকুর” নামে অভিহিত করে থাকেন।
প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই শিলাটি কেবল একটি পাথর নয়—এটি মানুষের ভক্তি, প্রার্থনা ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অমূল্য প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে এখানে অসংখ্য মানুষ এসে তাদের মনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-কষ্ট এবং স্বপ্নের কথা প্রকাশ করেছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত “বুড়া পূজা” এই শিলাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এই পূজায় মানুষ শুকর, ছাগল পাটা ও কবুতর উৎসর্গ করে তাদের মানত পূরণ করে থাকে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়—এটি মানুষের বিশ্বাস, ভরসা এবং জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।
এই শিলাকে ঘিরেই “বুড়ার পাট” নামের উৎপত্তি, যা আজ পুরো এলাকাকে একটি আলাদা পরিচয় দিয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরাও এখানে আসে—কেউ মানত নিয়ে, কেউ বা কৃতজ্ঞতা জানাতে। এই স্থানটি যেন এক মিলনমেলা, যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ এক সুতোয় গাঁথা।
তবে এই ঐতিহ্যের পথে একসময় নেমে এসেছিল অন্ধকার। ১৯৯৭/৯৮ সালের দিকে রহস্যজনকভাবে এই শিলাটি হারিয়ে যায়। ধারণা করা হয়, এটি চুরি হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, চোরেরা এটি দূরে নিয়ে যেতে পারেনি—প্রায় ৩ কিলোমিটারের মধ্যেই কোথাও এটি থেকে যায়। বহু খোঁজাখুঁজির পরও তখন শিলাটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে মানুষের মনে হতাশা নেমে এলেও বিশ্বাসের আলো কখনো নিভে যায়নি।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, ৩১ মার্চ—২০২৬ ইং এই দিনটি বুড়ার পাটের ইতিহাসে এক আনন্দঘন মুহূর্ত হয়ে আসে। জানা গেছে , হারিয়ে যাওয়া সেই শিলাটি এতদিন একটি হিন্দু দোকানে ছিল, যেখানে শিলাটিকে সাধারণ কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।অবশেষে শিলাটি কে উদ্ধার করে তার নিজস্ব স্থানে, “বুড়ার পাটে” ফিরিয়ে নিয়ে আনা হয়েছে । শিলাটি ফিরিয়ে আনার খবরে এলাকায় নেমে এসেছে হাজার হাজার মানুষের ঢল। হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষজন ভিড় জমাচ্ছে তাদের প্রিয় ঐতিহ্যকে শিলাটিকে এক নজর দেখার জন্য।