চ্যানেল ওম নিউজ ডেস্ক
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে ছোট হলেও সামাজিক প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে নেপাল যে কখনওই নীরব থাকে না, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। নেপাল জুড়ে বিভিন্ন শহরে ও জনপদে যে প্রতিবাদ, মিছিল ও সমাবেশ দেখা গেল, তার কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিবেশী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ।

কাঠমান্ডু থেকে শুরু করে জনকপুর, বীরগঞ্জ, বিরাটনগর, রাস্তায় রাস্তায় জমে উঠল ক্ষোভ। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান। দাবি একটাই, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনও নাগরিক যেন হিংসার শিকার না হন, এই বার্তাই ছিল প্রতিবাদের মূল সুর।

এই প্রতিবাদ শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং নেপালি সমাজের একটি গভীর মানসিক অবস্থানকে সামনে আনে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, নেপালে হিন্দু পরিচয় কেবল ধর্মীয় পরিচয় নয়, এটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং জাতিগত আত্মবোধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে প্রতিবেশী দেশে সেই পরিচয়ের উপর আঘাত এলে, তার প্রতিক্রিয়া সীমান্তে আটকে থাকে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট। এই আন্দোলন কোনও রাষ্ট্রীয় যুদ্ধঘোষণা নয়, কোনও কূটনৈতিক হুমকিও নয়। এটি মূলত নাগরিক সমাজের চাপ, এক ধরনের নৈতিক বার্তা। কিন্তু সেই বার্তার ভাষা এতটাই কঠোর যে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তা উপেক্ষা করা কঠিন।

নেপালের বহু বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মী প্রকাশ্যে বলেছেন, সংখ্যালঘু নির্যাতন কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মানবাধিকার সর্বজনীন, সীমান্ত মানে নৈতিক দায় থেকে মুক্তি নয়। তাঁদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে এই প্রশ্ন, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ধর্মের ভিত্তিতে হত্যা বা নিপীড়ন কি কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

এই প্রতিবাদের আর একটি দিকও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। নেপালের তরুণ প্রজন্ম। সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় এই প্রজন্ম রাস্তায় নেমে এসেছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রশ্ন তুলেছে, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। তাঁদের ভাষায় ক্ষোভ আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে এক ধরনের সংগঠিত সচেতনতা।

বাংলাদেশ সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিবাদ নিয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া এখনও সীমিত। তবে কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই ধরনের প্রতিবাদ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সম্পর্কের উপর চাপ তৈরি করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু প্রশ্ন নতুন নয়, কিন্তু নেপালের মতো দেশের প্রকাশ্য অবস্থান বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিল।

সব মিলিয়ে নেপালের এই দৃশ্য একাধিক প্রশ্ন সামনে আনছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে কতটা জোরে কথা বলা উচিত। ধর্মীয় পরিচয় কি কেবল ব্যক্তিগত বিষয়, না কি তা সামষ্টিক দায়বদ্ধতার জন্ম দেয়। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই অঞ্চলে সংখ্যালঘু সুরক্ষার দায় কে নেবে।

নেপালের রাজপথে ওঠা সেই কণ্ঠস্বর আপাতত থামার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ছোট দেশ হলেও বার্তাটা বড়। সীমান্তের ওপারে সেই বার্তা কতটা শোনা হবে, সেটাই এখন দেখার।